প্রোডাক্ট প্রাইসিং ব্যবসার সবথেকে গুরত্বপূর্ণ একটা বিষয়। প্রাইসিং স্ট্র্যাটেজি আপনাকে উপরে তুলে দিতে পারে আবার ডুবিয়েও দিতে পারে। তাই এমনভাবে প্রাইস সেট করতে হয় যাতে দিনশেষে আপনার পকেটে যেন কিছু থাকে। দীর্ঘদিন ধরে যেহেতু এই সেক্টরে কাজ করছি সেই অভিজ্ঞতায় দেখলাম অনেকের বিজনেস করার চমৎকার সুযোগ থাকলেও শুধু মাত্র ভুল প্রাইসিং স্ট্র্যাটেজির কারণে আগাতে পারছেন না, এমনকি ওনি আদতে লসই করছেন সেটি বুঝতেও পারছেন না৷ যদি ভুল না করি তাহলে এমন কেউ নেই যিনি এই প্রাইসিং নিয়ে সমস্যায় পড়েন নি। তাই নিজের অভিজ্ঞতা, পড়াশোনা থেকে কিছু বিষয় লেখার সাহস করছি,যদিও আমিও এই বিষয়ে এখনো অভিজ্ঞ হয়ে উঠিনি
ই-কমার্স বিজনেসে দুই ধরণের সেলার পাওয়া যায়।
যারা নিজেরা পন্য উৎপাদন করে বিক্রি করছেন,
অন্যের থেকে প্রোডাক্ট কিনে বিক্রি করছেন ।
প্রাইস সেট করার সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল আপনার সবধরনের খরচ হিসেব করা, আর এখানেই সবাই আসল ভুলটা করেন। অনেকগুলো খরচ ওনারা হিসেবই করেন না যার ফলে দেখা যায় লাভের টাকা কোনদিন দিয়ে হাওয়া হয়ে যায় সেটা ওনারা বুঝতেই পারেন না । তাহলে চলুন দেখি প্রাথমিক ভাবে কোন কোন খরচগুলো আমাদের হিসেব করতে হয়।
- ১. প্রোডাক্ট সোর্সিং খরচঃ– আপনি নিজে কাঁচামাল কিনে পণ্য রেডি করেন বা রিসেল করুন, দিনশেষে আপনি ঠিকই অনেক খুঁজে প্রোডাক্ট সোর্সিং করতে হয়। আর এই পন্য খুঁজে বের করা থেকে শুরু করে পন্য ক্রয় পর্যন্ত যতপ্রকার খরচ হবে সবই আপনাকে হিসেবে আনতে হবে অতিঅবশ্যই
- ২. পরিবহন খরচঃ– পন্য পাইকার থেকে তো কিনে ফেললেন। এখান বাসায় বা কারখানায় তো আনতে হবে তাই না? আপনার বাসায় বা কারখানায় আনা পর্যন্ত পরিবহনে যত ধরণের খরচ হবে সেগুলো হিসেবে আনতে হবে। এমনকি আপনি যে ১০ টাকা রিকশা ভাড়া দিচ্ছেন, ২০ টাকা কুলিকে বকশিস দিচ্ছেন সেটাও আপনাকে হিসেব করতে হবে।
- ৩. মার্কেটিং খরচঃ– ব্যবসার ক্ষেত্রে একটা কথা বলা হয়, অন্ধকারে সুন্দরীর দিকে তাকিয়ে হাসা এবং মার্কেটিং ছাড়া পন্য বাজারে ছাড়া একই কথা, দুইটাই দিনশেষে ভ্যালুলেস। আপনার কাছে পন্য আছে কিন্তু মার্কেটিং না করলে সেটা মানুষ জানবে কি করে? তাই মার্কেটিং এর পিছনে পন্য প্রতি কত টাকা খরচ করবেন সেটাও আপনাকে হিসেব করতে হবে। এখন অনেকে বলতে পারেন আমি তো অনলাইনে সেল করি, এখানে তো আমার খরচ নাই৷ কিন্তু এখানেও খরচ আছে, আপনি যে বুস্টিং করছেন সেটাও তো আপনার মার্কেটিং খরচ তাই না?? ব্যবসার শুরুর দিকে আমি একবার ১ হাজার টাকা বুস্ট করিয়েছিলাম, কিন্তু অর্ডার গুলো প্রসেস করার পর হিসেব নিকেশ করে দেখি আমার হাত খালি কারণ পণ্য বেঁচে যতটাকা লাভ করেছিলাম সবটাই ঐ বুস্টের খরচে চলে গেসে। এমনটা হয়েছিল কারণ আমি তখন মার্কেটিং খরচটা আমার প্রোডাক্টে এড করি নি
- ৪. প্যাকেজিং খরচঃ– যত যাই বলেন না কেন, দিনশেষে এটাই সত্য যে মানুষ আগে দর্শনধারী,তারপর গুনবিচারি। তাই সুন্দর একটা প্যাকেজিং প্রোডাক্ট ভ্যালু বাড়িয়ে দেয় অনেকগুন। আপনাকে এমন ভাবে প্যাকেজিংটা দিতে হবে যাতে কাস্টমার সেটা অন্য কাউকে গিফট করতে পারে। তাছাড়া একটা ভাল প্যাকেজিং ডেলিভারির সময় আপনার প্রোডাক্টটকে ক্ষতির হাত থেকেও বাঁচাবে। ভাল প্যাকেজিং দিয়েই চাইলে আপনি ১০০ টাকার প্রোডাক্ট ৫০০ টাকায় সেল করতে পারবেন। তাই প্রোডাক্ট প্রতি প্যাকেজিং এর পিছনে কত খরচ করবেন সেটা বিবেচনায় আনতে হবে, যেটা অনেকেই হিসেব করেন না
- ৫. ক্ষতিপূরণ খরচঃ– ধরুন আপনি ১০টি প্রোডাক্ট আনলেন, কিন্তু এটার কি কোন নিশ্চয়তা আছে আপনার সবগুলো প্রোডাক্টই সেল হয়ে যাবে? বা কোন পন্য ডেলিভারির সময় বা অন্য কোন ভাবে নষ্ট হবে না? তাই আপনাকে অতি অবশ্যই সেই বিষয়টা মাথায় রেখে একটা একাউন্ট আলাদা করে রাখতে হবে। গার্মেন্টস আইটেমের দোকানে প্রতিবছর তাদের ১-১.৫ লক্ষ টাকার প্রোডাক্ট লস হিসেবে থেকে যায়। তাই তারা ৬ পিসের বান্ডেলকে ৫ পিস হিসেব করে এমন ভাবে প্রাইজ সেট করেন যাতে ১ পিস বিক্রি না হলেও খরচ এবং লাভটা যেন উঠে আসে। তাই আপনাকে মাথায় রাখতে হবে আপনার কিছু প্রোডাক্টে ক্ষতি হবেই, তাই ব্যাকআপটাও আপনাকে রাখতে হবে।
- ৬. ডেলিভারি খরচঃ– যদিও মোটামুটি সবাই আলাদা ডেলিভারি চার্জ রাখেন তারপরও নূন্যতম একটা একটা ডেলিভারি চার্জ আপনাকে প্রাইজের সাথে যুক্ত করতে হবে। কেন? অনেক সময় আপনাকে ফ্রি ডেলিভারিও দিতে হতে পারে কিন্তু খরচটা তো ঠিকই হবে। আবার অনেক সময় দেখা যায় কুরিয়ার চাচ্ছে ১৫০ টাকা, কিন্তু কাস্টমার ১২০ টাকার বেশি দিতে রাজী নয়। তাহলে কি আপনি ঐ ৩০ টাকা নিজের পকেট থেকে দিবেন নাকি পুরো অর্ডারটিই ক্যান্সেল করে দিবেন??
- ৭. পরিচালন খরচঃ– বিজনেস করবেন শখের বসে নয়, প্রফেশনালী। এবং বিজনেস করতে গেলে অনেক ধরণের পরিচালন ব্যায় থাকে। সেগুলোও আপনাকে অবশ্যই হিসেব করতে হবে। আপনার কাস্টমারের সাথে ফোনে কথা বলছেন সেখানে আপনার একটা ফোন বিল আছে, আপনি অর্ডারগুলো খাতায় লিখে রাখছেন, আপনি অর্ডারের সাথে সাথে মেমো দিচ্ছেন, আপনি ব্যবসার প্রচারের জন্য ভিজিটিং কার্ড দিচ্ছেন এগুলো সবগুলোই তো আপনার খরচ তাই না?? অনেকেই এই খুঁটিনাটি বিষয়গুলো হিসেব করতে ভুলে যান
- ৮. নিজের উৎপাদিত প্রোডাক্টের ক্ষেত্রে আপনার পরিশ্রমের মূল্যঃ– আপনি নিজে পরিশ্রম করে যেহেতু একটু প্রোডাক্ট তৈরি করছেন তাই অবশ্যই আপনাকে সেটার আর্থিক মূল হিসেব করতে হবে। আপনি এই কাজটা অন্য কাউকে দিয়ে করালে তাকে স্যালারি দিতেন। অথবা এই সময়টাতে অন্য কোথাও চাকরি করলে তো ঠিকই মাসিক একটা স্যালারি পেতেন তাই না?? তাহলে আপনার ব্যবসায়ে কেন আপনার স্যালারি হিসেব করবেন না?
মাত্র এই কয়টি বিষয়ই কিন্তু শেষ নয়৷ ব্যবসার ধরন ভেদে আরো অনেকগুলো খরচও আমাদের হিসেব করতে হয়৷ মাথা ঘুরাচ্ছে? হিসেব কঠিন মনেহচ্চে?? ভাবছেন কিভাবে এত হিসেব করবো? আরে দাঁড়ান, দাঁড়ান মশাই, আপনার জন্য অভিজ্ঞজনরা সহজ পরামর্শও দিয়ে রেখেছেন। অভিজ্ঞজনরা পরামর্শ দেন রিসেল প্রোডাক্টের ক্ষেত্রে পাইকারি ক্রয় মূল্যের সাথে ৪৫-৫০% খরচ যোগ করার জন্য। যেমন, পাইকারিতে ১০০ টাকায় প্রোডাক্ট কিনলে তারসাথে ৪৫% খরচ যোগ করে নীট খরচ ধরতে হবে ১৪৫/-। এর মধ্যে মোটামুটি সব খরচ চলে আসে বলে ধরা। তবে এটাই নির্ধারিত নয়, ব্যবসার ক্ষেত্র বিশেষে এটা কম-বেশি হতে পারে।
এই তো গেল, খরচের হিসেব। এবার আসি প্রফিটের হিসেবে। যদিও এটা একেক জনের একেক রকম হয়,যার যার পছন্দমত প্রফিট মার্জিন সেট করে থাকেন। কেউ ১৫% প্রফিট করেন তো কেউ ৪০%। তাইতো আমরা একই প্রোডাক্টের ভিন্ন ভিন্ন প্রাইজ দেখে থাকি। তবে এখানেও অভিজ্ঞজনরা পরামর্শ দিয়ে থাকেন,নূন্যতম ২৫-৩০% প্রফিট মার্জিন রাখার জন্য। এর কমে প্রফিট মার্জিন রাখলে আপনি খুব বেশিদিন মার্কেটে টিকতে পারবেন না, যদি না আপনার বাল্ক এমাউন্টে সেল হয়।
এখন প্রশ্ন আসতে পারে এত কিছু হিসেব করতে গেলে তো পণ্যের দাম অনেক বেড়ে যাবে, মানুষ তো কিনবে না। এখন যদি পাল্টা প্রশ্ন করি, আমাকে এটা দেখান যে দুনিয়ায় কোন দামী জিনিসটা আনসোল্ড থাকে?? রাস্তার পাশের টং দোকানের ৫ টাকার চা যেমন সেল হয়, একটু ভাল হোটেলের ১০ টাকার চাও যেমন সেল হয়, তেমনি Radisson এর ১৫০ টাকা দামের চাও কিন্তু সেল হয়। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে টার্গেট কাস্টমার খুুঁজে বের করা এবং তারা সেসব জায়গায় একটিভ থাকে সেখানে আপনার পণ্যের মার্কেটিং করা। ব্র্যান্ডের দোকান ছাড়া শপিংই না করা মানুষের কাছে যেয়ে যদি আপনি হকার্স মার্কেটের মত করে মার্কেটিং করেন তাহলে তিনি কখনোই আপনার থেকে কিনবে না। আপনাকে তার পছন্দমত করেই মার্কেটিংটা করতে হবে।
সবসময়ই একটা কথা মাথায় রাখবেন “আপনি ব্যাবসায় করতে এসেছেন, চ্যারোটি খুলে বসেন নি“। একজন ব্যাবসায়ী কখনো নিজের পকেটের টাকা খরচ করে কাস্টমারকে সুবিধা দেয় না, সে সকল সুবিধার টাকা প্রোডাক্টের প্রাইজের সাথে যুক্ত করে কাস্টমার থেকেই নিয়ে নেয়। ব্যাপারটা হচ্ছে কাস্টমারের টাকায় কাস্টমারকে সুবিধা দেওয়া। টেরিবাজারে বড় এমাউন্টের শপিং যেমন বিয়ের শপিং করতে গেলে দেখবেন তারা আপনাকে নাস্তাও করাবে। যদি ভাবেন যে সে নিজের টাকায় এটা করাচ্ছে তাহলে ভুল করবেন, তিনি ঠিকই আপনার বিলের মধ্যে নাস্তার টাকাটাও এড করে দিবে যেটা আপনি বুঝবেনই না
প্রোডাক্ট প্রাইজিং এর সাথে সবসময়ই মাথায় রাখতে হবে প্রোডাক্ট কোয়ালিটি এবং প্রেজেন্টেশন অনুসারে প্রাইসটা যেন মার্কেট প্রাইসের সাথে ম্যাচ করে। আপনি যদি ব্র্যান্ডের শোরুমে হকার্স মার্কেটের মত দাম রাখেন বা হকার্সে যদি ব্র্যান্ডের মত দাম রাখেন তাহলে কিন্তু হবে না। দাম বেশি হয় তো মানুষ কিনবে না,আবার কম হয় তো মানুষ পন্যের মান নিয়ে সন্দেহ করবে। তাই সবসময় মার্কেটের প্রাইসের কথা মাথায় রাখতে হবে
তো নিজের ক্ষুদ্র জ্ঞান থেকে অনেক লম্বা আলোচনা হয়ে গেল৷ পুরো লেখাতে যদি কোন ভুল থাকে তাহলে ক্ষমা করবেন এবং ভুলটি শুধরে দিবেন। আমিও শিখে নিব আপনার৷ ব্যবসায়ে শেখার কোন শেষ নেই।

